বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত না থাকায় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে ডলারের মতো নিরাপদ মুদ্রার দিকে ঝুঁকছেন।
সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধটি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত শেষ হতে পারে। এতে সাময়িকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ে। তবে ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বাধা দিচ্ছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম কতটা বাড়ে এবং কতদিন স্থায়ী হয়—তার ওপরই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব নির্ভর করবে। তারা সতর্ক করে বলেন, যদি সংঘাত কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে এবং জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এ পড়তে পারে—যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায় কিন্তু মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।
বুধবারের লেনদেনে তেলের দামও কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। এর আগে দিনের শুরুতে দাম কমে গেলেও পরে বাজারে আবার উদ্বেগ বাড়ে। কারণ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি মজুত ছাড়ার যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, তা সরবরাহ ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট হবে কিনা—তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
মুদ্রাবাজারে ইউরোর দর প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১ দশমিক ১৬১১ ডলারে লেনদেন হয়। ব্রিটিশ পাউন্ডও প্রায় স্থিতিশীল থেকে ১ দশমিক ৩৪১৯ ডলারে ছিল। অন্যদিকে জাপানি ইয়েন দুর্বল হয়ে প্রতি ডলারে ১৫৮ দশমিক ৩৮ ইয়েনে নেমে আসে। ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান পরিমাপকারী ডলার সূচকও প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৯৮ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে ছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার সাধারণত বড় ধাক্কা সামলাতে পারে যদি সামনে এগোনোর পথ স্পষ্ট থাকে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় অনিশ্চয়তায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের পরিচালক খালিদ আজিম বলেন, আর্থিক বাজার বড় ধরনের ঝাঁকুনি সামাল দিতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে বাজারের অস্থিরতা বাড়ে।
এদিকে সংঘাতের ১২তম দিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনীর পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। তেহরান সরকারও সতর্ক করে বলেছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আবার শুরু হলে তা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার জ্যেষ্ঠ মুদ্রা কৌশলবিদ ক্রিস্টিনা ক্লিফটন মনে করেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে—যদিও পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত।
এদিকে সুদের হার নিয়ে বাজারে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ফেড ফান্ডস ফিউচার্স বাজারের হিসাব অনুযায়ী, বছর শেষের আগে মোট প্রায় ৩৯ দশমিক ৭ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, অনেক বিনিয়োগকারী নিশ্চিত নন যে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বিতীয়বারের মতো ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমাবে কিনা।
একই সময়ে গত এক সপ্তাহে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়াতে পারে। তবে ব্যাংকটির নীতিনির্ধারকেরা বলেছেন, নীতি পরিবর্তনের আগে পরিস্থিতি আরও সময় নিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুন থেকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে।
বাজারের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফেব্রুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এ মাসে মূল ভোক্তা মূল্য সূচক শূন্য দশমিক ২ শতাংশ এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তে পারে।