{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}

একটা সাদা পাথর কুড়িয়ে এনেছিলাম সিলেটের জাফলং থেকে, টলটলে পাহাড়ি পানির নিচে সাদা পাথরগুলো নাকি আসত পাহাড়ি নদী বেয়ে। সেই পাথরটা এখনো আমার বাসায়। পাথরের সাথে আমার আরও সখ্য হয় দাদার বাড়ির পাশে রেললাইনে যখন রেলগাড়ি দেখতে যেতাম, ছোট ছোট পাথর রেললাইনে রেখে অপেক্ষা করতাম কখন এর ওপর দিয়ে গাড়িটা যাবে, তার অবস্থা কী হয়, তাই দেখব বলে। পাথরের প্রতি ভালোবাসা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার থিসিসের বিষয় হয়ে গেল-মধ্যপাড়া পাথরখনি। একদিন সত্যিই নেমে গেলাম মাটির গভীরে, লোহার খাঁচার মতো এক লিফটে চড়ে। অন্ধকার ভেদ করে যখন বিশাল পাথরের স্তরের সামনে দাঁড়ালাম, মনে হলো বহুদিনের এক রহস্যের জট খুলে গেছে—শৈশবের সেই সাদা পাথর, রেললাইনের পাথর, পাহাড়ি নদীর পাথর—সবকিছুর উৎস লুকিয়ে আছে এই গভীর পৃথিবীর ভেতরে।
সকালে আপনি যখন ঘর থেকে বের হন, হয়তো খেয়ালই করেন না আপনার পায়ের নিচের রাস্তা, মাথার ওপরের ছাদ, যে সেতু দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ নদী পার হয়—সবকিছুর ভেতরে লুকিয়ে আছে পাথর। স্কুলের মাঠ, হাসপাতালের মেঝে, রেললাইনের নিচের ব্যালাস্ট সবখানেই পাথর নীরবে দেশের উন্নয়নকে ধরে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পাথর কোথা থেকে আসে? আমরা কি নিজের মাটির নিচের সম্পদ ব্যবহার করছি, নাকি উন্নয়নের ভিত্তি গড়ছি বিদেশি পাথরে?
আমদানিনির্ভর উন্নয়নের বাস্তবতা
গত এক দশকে বাংলাদেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাত যে গতিতে এগিয়েছে সড়ক, সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল তাতে কোটি কোটি টন স্টোন অ্যাগ্রিগেট প্রয়োজন হয়েছে। বাস্তবতা হলো এই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে বাংলাদেশকে ভারত ও ভুটান থেকে বিপুল পরিমাণ বোল্ডার ও ভাঙা পাথর আমদানি করতে হয়। বুড়িমারী, তামাবিল ও শেওলা স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ টন পাথর দেশে প্রবেশ করে।
গত ২০ বছরে আমদানির ভরকেন্দ্র ছিল ভারত, বিশেষ করে মেঘালয় ও আসাম অঞ্চল থেকে আসা বোল্ডার। ভুটান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। অন্যদিকে চীন থেকে এসেছে প্রক্রিয়াজাত গ্রানাইট স্ল্যাব ও মার্বেল; মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম থেকে সীমিত পরিসরে গ্রানাইট ব্লক; ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও কিছু প্রক্রিয়াজাত পাথর আমদানির রেকর্ড রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের উন্নয়নের বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে আঞ্চলিক আমদানির ওপর।
কিন্তু এই আমদানির পেছনে কেবল চাহিদা নয়, একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটও কাজ করে। সীমান্তঘেঁষা আমদানিকারক চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার দেশীয় খনির সম্প্রসারণে ততটা মনোযোগ না দিয়ে আমদানিকে কার্যত উৎসাহিত করেছে নিম্ন শুল্ক কাঠামো, সহজ প্রবেশাধিকার এবং নীতিগত বাধ্যবাধকতার অভাবের কারণে বিদেশি পাথর বাজারে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এতে লাভবান হয়েছে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী; কিন্তু দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদ রয়ে গেছে অব্যবহৃত, আর বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে গেছে দেশের বাইরে।
মধ্যপাড়া: আমাদের নিজের শক্ত ভিত্তি—
দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট খনি বাংলাদেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ গ্রানাইট খনি। ১৯৭৪ সালে আবিষ্কৃত এই খনি ২০০৭ সালের ২৫ মে থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। নকশাগত দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫,৫০০ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক গড় উৎপাদন সক্ষমতা ১.৬৫ মিলিয়ন টন। খনি এলাকার আয়তন প্রায় ১.২ বর্গকিলোমিটার।
এখানে মোট গ্রানাইট মজুত রয়েছে প্রায় ১৭৩.৮০ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুত প্রায় ৬৯.৭৪ মিলিয়ন টন অর্থাৎ মোট মজুতের প্রায় ৪২ শতাংশ সরাসরি ব্যবহারযোগ্য। বর্তমান হিসাবে খনিটির সম্ভাব্য আয়ু প্রায় ৫০ বছর, যা ভবিষ্যতে ৭০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
ইতিমধ্যে প্রায় এক কোটি টনের বেশি পাথর উত্তোলন হয়েছে। সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনা চুক্তির আওতায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাথর উৎপাদন হয়েছে এবং চুক্তির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, গণপূর্ত বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই পাথরের প্রধান ব্যবহারকারী।
গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে মধ্যপাড়ার পাথরের ঘনত্ব ও শক্তি ভালো, ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা উচ্চ এবং কংক্রিটের জন্য উপযোগী। অর্থাৎ গুণগত মানের দিক থেকে দেশীয় পাথর আন্তর্জাতিক মানে উত্তীর্ণ।
নতুন খনি—
মধ্যপাড়া খনির সাম্প্রতিক বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও নতুন ড্রিলিং কার্যক্রমে দেখা গেছে, বিদ্যমান খনির দক্ষিণ-পূর্ব অংশে প্রায় ২.২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিপুল পরিমাণ উচ্চমানের গ্রানাইটের মজুত নিশ্চিত হয়েছে। ভূমি পৃষ্ঠের প্রায় ১২৮ থেকে ১৬২ মিটার নিচে শক্ত, খননযোগ্য গ্রানাইট স্তর শুরু হয়েছে এবং একাধিক ড্রিলহোলে ৩০০ মিটারের বেশি পুরুত্বের গ্রানাইট পাওয়া গেছে, যা ৪৫০ মিটারের নিচেও অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ এই খনির সম্ভাব্য উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক দশক পর্যন্ত টেকসই হতে পারে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে নতুন লেভেলে খনি পরিচালনা করলে প্রায় ৪০ বছর ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রমাণিত রিজার্ভ প্রায় ১১৩ মিলিয়ন টনের বেশি। বর্তমানে বছরে প্রায় ১ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি উৎপাদন হলেও নকশাগত সক্ষমতা ১.৬৫ মিলিয়ন টন এবং নতুন সম্প্রসারণ এলাকা যুক্ত হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৩ মিলিয়নের বেশি টন উৎপাদন বৃদ্ধির বাস্তব সুযোগ রয়েছে। শুধু ক্রাশড স্টোন নয়, ভবিষ্যতে গ্রানাইট স্ল্যাব উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ পাথরের মজুত ব্যবহার ঠিকমতো না করে বিদেশি নির্ভরতার সমস্যার মূল আসলে সম্পদের অভাব নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ও পরিকল্পনাগত ঘাটতি। মধ্যপাড়ার মতো সমৃদ্ধ খনি থাকা সত্ত্বেও সময়মতো উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হয়নি, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়নি। দিনাজপুর থেকে বড় বাজারে পাথর পৌঁছাতে রেলভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগও পর্যাপ্ত নেই, ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে দেশীয় পাথর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে দেশীয় পাথর ব্যবহারের কোনো বাধ্যতামূলক নীতি না থাকায় ঠিকাদারেরা সহজলভ্য আমদানিকৃত উৎসের দিকে ঝুঁকেছে। এর ওপর আমদানির ক্ষেত্রে কার্যকর নিরুৎসাহ করে এমন শুল্ক কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি বর্তমান ৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট আমদানিকে থামানোর মতো শক্তিশালী নয়। ফলে একটি সমন্বিত শিল্পনীতি না থাকায় দেশীয় সম্পদ ব্যবহার না করে আমদানিনির্ভর একটি কাঠামোই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাই এখন প্রয়োজন একটি সুসংহত নীতি ধাপে ধাপে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি, সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে ৫০–৭০% দেশীয় পাথর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, বিদ্যমান স্টক দ্রুত বাজারজাত করা এবং ফেজ–২ সম্প্রসারণকে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব (PPP) মডেলে বাস্তবায়ন করে দক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এতে সরকার নিয়ন্ত্রক ও রাজস্ব সংগ্রাহক হিসেবে লাভবান হবে, বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা আনবে, আর দেশ পাবে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিরাপত্তা। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ৩–৫ বছরের মধ্যে আমদানি ৩০–৫০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন গতি সৃষ্টি হবে এবং সরকার স্থিতিশীল রাজস্ব প্রবাহ পাবে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পাথর সরবরাহের সক্ষমতা আমাদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে, প্রয়োজন শুধু সঠিক বিপণন, নীতিগত সহায়তা ও চাহিদা নিশ্চিত করা।
এখন প্রশ্ন একটাই, আমরা কি নিজেদের ভূগর্ভের শক্ত ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে আত্মনির্ভর উন্নয়ন চাই, নাকি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও আমদানিনির্ভর নীতির কারণে বিদেশি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে উন্নয়ন চালিয়ে যাব? সিদ্ধান্ত আমাদেরই।
লেখক: মোহাম্মদ আনিসুর রহমান রানা, ভূতত্ত্ববিদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সোসাইটি