
নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরের শহর বোডো। ৫৫ হাজার জনগোষ্ঠীর এই শহর মাছ ধরার শহর হিসেবে বিখ্যাত। বোডোবাসীর জীবন কখনোই সাধারণ নয়। গ্রীষ্মকালে এই শহরে সূর্য টানা কয়েক সপ্তাহ অস্ত যায় না, আর শীতকালে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সূর্যের দেখা মেলে না।
এমনকি এক রাতের উইন্টার স্টর্ম (শীতকালের তীব্র ঝড়) শহরটিকে পুরো বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। ঘূর্ণি বাতাস এখানে প্রতিদিনের সঙ্গী; আর তুষারের কথা তো বলাই বাহুল্য। মে মাসের মাঝামাঝিও হঠাৎ তুষারপাত শুরু হতে পারে, ঠিক যখন মনে হয় বসন্ত বুঝি এসেই গেল!
প্রাকৃতিকভাবে এমন বৈচিত্র্যময় ও চমকের শহর থেকে উঠে আসা একটি ক্লাব বোডো/গ্লিমট, চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে যেন তেমন চমকই দেখাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউরোপিয়ান পরাশক্তিদের ওপর বইয়ে দিয়েছে বোডোর সেই বিখ্যাত ‘শীতঝড়’, যে ঝড়ে ম্যানচেস্টার সিটি ও আতলেতিকো মাদ্রিদের মতো পরাশক্তির পর গতকাল রাতে উড়ে গেল ইন্টার মিলানও। টানা দুই লেগে (৫-২ গোলে) ইন্টারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে আসা বোডো/গ্লিমট।
অথচ কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন বোডো/গ্লিমটের খেলার সময় স্টেডিয়ামের অর্ধেকটাই খালি পড়ে থাকত। অর্ধেক শূন্য হয়ে থাকা গ্যালারির সেই হাহাকার অবশ্য এখন অতীত। বোডো/গ্লিমটের সাম্প্রতিক সাফল্য উত্তর নরওয়েজুড়ে নতুন বিপ্লব নিয়ে এসেছে। ম্যাচের দিন হোক বা না হোক, শহরের প্রতিটি কোণে, এমনকি স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের বাইরেও উড়তে দেখা যায় উজ্জ্বল হলুদ পতাকা। আর গতকাল রাতে ইতিহাস গড়ার পর উত্তর নরওয়েজিয়ানরা যে এখন আবেগের অন্য এক চূড়ায় পৌঁছে গেছে, তা বলাই যায়।
বোডোতে এখন ক্লাবটির ম্যাচের দিন ছোট শিশু থেকে দাদা-দাদি পর্যন্ত সবাইকে দেখা যায় হলুদ পোশাকে। এমনকি ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগেও সুপারমার্কেটের সামনে লোকজনকে বোডো/গ্লিমটের কিট পরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্ডারগার্টেন ও স্কুলগুলোও ম্যাচ ডে উদ্যাপন করা হয় চেঁচিয়ে বোডো/গ্লিমটের গান গেয়ে! তবে আর্কটিকের এই ফুটবল–উন্মাদনা ইন্টারের বিপক্ষে জয়ের পর কোথায় ঠেকে, তা–ও দেখার মতো বিষয় হবে।
ফুটবলমঞ্চে বোডো/গ্লিমটের সাম্প্রতিক উত্থানটা যেন স্বপ্নের মতো। ২০১০ সালে ক্লাবটি প্রায় দেউলিয়া হওয়ার মুখে ছিল, খেলোয়াড়েরা মাসের পর মাস বেতন ছাড়াই খেলতেন। আর উত্তর নরওয়েজিয়ানরা তাঁদের প্রিয় দল বাঁচাতে নতুন উপায় খুঁজছিলেন। স্থানীয় লোকজন শহরের রাস্তায় ঘুরে খালি বোতল সংগ্রহ করতেন, যেগুলো ফেরত দিয়ে পাওয়া টাকা ক্লাবকে দেওয়া হতো। মৎস্যজীবীরা ক্লাবকে মাছ দিতেন বিক্রির জন্য, স্থানীয় হ্যান্ডবল দল তাদের টিকিট থেকে আয় দান করেছিল ক্লাবটিকে। পাশাপাশি স্থানীয় রেডিওতে বড় ধরনের তহবিল সংগ্রহের অভিযানও চালানো হয়েছিল। দলের জন্য এই তহবিল সংগ্রহ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্লাবের সাবেক খেলোয়াড় ও বর্তমান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার প্যাট্রিক বার্গের মামা রানার বার্গ।
বার্গ পরিবার ক্লাবটিতে আট দশক ধরে অবদান রেখে চলেছে। হারাল্ড বার্গ ১৯৫৮ সালে বোদো/গ্লিমটে অভিষিক্ত হন। তাঁর তিন ছেলে রানার, অরান ও আরিল্ডও খেলেছেন এই ক্লাবের হয়ে। আর এখন খেলছেন একই পরিবারের থেকে উঠে আসা প্যাট্রিক।
মানুষের ভালোবাসাই মূলত ক্লাবটিকে সে যাত্রায় টিকে থাকতে সাহায্য করে; যদিও সেটি ছিল সাময়িক। ২০১৬ সালে এসে বোডো/গ্লিমট নরওয়ের শীর্ষ পেশাদার লিগ থেকে অবনমিত হয়ে যায়। পাশাপাশি টানা কয়েক বছর ধরে আর্থিক সংকটের কারণেও বেশ ধুঁকেছিল তারা। কিন্তু এরপরই যেন ভোজবাজির মতো বদলে যেতে শুরু করে সব। ২০২৫ সালে দলটি নরওয়ের লিগের সবচেয়ে ধনী ক্লাবের মার্যাদা পায় বোডো/গ্লিমট, যা সম্ভব হয়েছে স্থানীয় খেলোয়াড়দের উন্নয়ন এবং মাঠে স্বপ্নের মতো সাফল্যের কারণে।